প্রবাস জীবন যেন এক উন্মুক্ত কারাগার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রবাস জীবন যেন এক উন্মুক্ত কারাগার। চারপাশে আকাশ খোলা, রাস্তাঘাট বিস্তৃত, সুযোগের দরজাও অগণিত—তবু কোথাও এক অদৃশ্য শিকল পায়ে জড়িয়ে থাকে। এই শিকল আইন-কানুনের নয়, দেয়াল-তালারও নয়; এটি ভাষার, স্মৃতির, আপনজনের মুখের, মাটির গন্ধের।
বিদেশের শহরগুলো ঝকঝকে, নিয়মতান্ত্রিক, সময়নিষ্ঠ, ব্যস্ত। সকালগুলো শুরু হয় অ্যালার্মের শব্দে, শেষ হয় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় ঢলে পড়ায়। কাজের ফাঁকে সহকর্মীদের সঙ্গে হাসি থাকে, সৌজন্য থাকে, কিন্তু হৃদয়ের ভেতরকার কথাগুলো অনুবাদহীন থেকে যায়। নিজের ভাষায় দু’কলি কথা বলার জন্য মন খুঁজে ফেরে পরিচিত মুখ, চেনা উচ্চারণ।
উৎসব এলে প্রবাস জীবনের শূন্যতা আরও স্পষ্ট হয়। ক্যালেন্ডারে লাল দাগ থাকলেও, এখানে সে দিনগুলো স্রেফ আরেকটা কর্মদিবস। দূরের দেশে বসে ভিডিও কলে দেখা যায় বাড়ির উঠোন, আলপনা আঁকা বারান্দা, মায়ের ব্যস্ততা, বন্ধুদের আড্ডা। স্ক্রিনের ওপাশে হাসি, এপাশে নীরবতা। সেই মুহূর্তে বোঝা যায়, দূরত্ব শুধু মাইলের নয়, অনুভূতিরও।
তবু এই উন্মুক্ত কারাগারের ভেতরেই মানুষ স্বপ্ন দেখে। নিজের ও পরিবারের ভালো ভবিষ্যতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে, নতুন দক্ষতা শেখে, নতুন সংস্কৃতিকে আপন করার চেষ্টা করে। ধীরে ধীরে শহরটা কিছুটা পরিচিত হয়, দোকানের মালিক নাম ধরে ডাকতে শেখে, পাশের বাসার প্রতিবেশী দরজায় কড়া নাড়ে। শিকলগুলো একটু ঢিলে হয়, নিঃসঙ্গতার দেয়ালে ছোট ছোট জানালা খুলে যায়।
প্রবাস জীবন তাই শুধুই বন্দিত্ব নয়, এটি এক দীর্ঘ পরীক্ষা। এখানে মানুষ নিজের ভেতরের শক্তিকে চিনতে শেখে, অভাবের মধ্যেও কৃতজ্ঞতা খুঁজে নেয়, দূরত্বের মধ্যেও সম্পর্ক আঁকড়ে ধরে। উন্মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে সে বুঝতে শেখে স্বাধীনতা কেবল ভৌগোলিক নয়, মানসিকও। আর সেই মানসিক মুক্তিই একদিন প্রবাসের কারাগারকে পরিণত করে সম্ভাবনার প্রান্তরে।